কনসেপ্ট আইটি অ্যান্ড এডুকেশনের স্বত্ত্বাধিকারী ফাহিম’কে মাদক সম্রাটদের গুম অত:পর ১৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ শেষে মুক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক::

দীর্ঘদিন যাবত মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও যুব সমাজকে অন্ধকার জগত থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ করে যাওয়া মৌলভীবাজারের ব্যবসায়ী “কনসেপ্ট আইটি অ্যান্ড এডুকেশন” এর স্বত্ত্বাধিকারী ও সামাজিক সংগঠন “উই ফর বাংলাদেশের” প্রতিষ্টাতা শাহ ফাহিম’কে তোলে নিয়ে গুম, অবর্ণনিয় নির্যাতন ও ১৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপন শেষে স্লুইচ গেইট ব্রিজে ফেলে রেখে যায় মাদক সম্রাটেরা। শাহ ফাহিম’কে একটি টর্চার ঘরে আটক করে তারা বলে, আগামীতে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করলে তাকে হত্যা করা হবে। এ ঘটনার পর থেকে চরম নিরাপত্তহীনতায় ভোগছেন শাহ ফাহিমের পরিবারের সদস্যরা।

জানা যায়, ২০শে জুলাই রাত ৯.৩৫ মিনিটে ফাহিম এর সহকর্মী মিনহাজ আহমদ জানায় “কনসেপ্ট” এর কম্পিউটার অপারেটর আকরাম হোসেন জনি গুরুতর অসুস্থ। জরুরি ভিত্তিতে তাকে দেখতে যাওয়া উচিত। তাৎক্ষণিকভাবে শাহ ফাহিম গিয়ে দেখতে পান জনির অনেক জ্বর, সর্দি-কাশি হয়েছে। ফাহিম কনসেপ্টের মার্কেটিং ম্যানেজার শেখ আমির হামজা’কে কিছু টাকা দিয়ে ফল ও ওষুধ কেনার জন্য পাঠানোর কিছুক্ষণ পরেই ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে ৮-১০ জন ক্ষুদ্ধ যুবকের একটি দল হঠাৎ করে জনির ঘরে ঢুকে পড়ে। তারা গালিগালাজ করতে থাকে ও আক্রমণাত্মক হয়ে হামলা শুরু করে। এক পর্যায়ে পিস্তল ধরে গুলি করার হুমকি দিয়ে শাহ ফাহিম’কে রশি দিয়ে বেঁধে মানিব্যাগ, হাতঘড়ি এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় এবং সেখান থেকে তুলে নিয়ে যায়। সন্ত্রাসীরা জোরপূর্বক  মাদকাসক্ত একজন মহিলার সাথে আলিঙ্গন করতে ফাহিম’কে বাধ্য করে এবং ছবি ও ভিডিও ধারণ করে। তখন তারা হুমকি দেয় প্রয়োজন হলে এইগুলো তারা ফেইসবুকে ছেড়ে দিবে।

ফাহিমের পরিবার বলেন, এরপর ৬-৮ জনের আরেকটি দল একটি মাইক্রোভ্যানে করে আসে। নিজেদেরকে একটি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য বলে দাবি করে। তাদের পড়নে সাধারণ পোশাক ছিল। তাই তারা কোন বাহিনীর সদস্য তা শনাক্ত করতে পারেননি ফাহিম। সাদা পোশাকধারীরা হাতে হাতকড়া পড়িয়ে চোখ দুটো বেঁধে জোর করে ভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। পরবর্তী তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে, তারা ফাহিম’কে উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তাঘাটে ঘুরিয়ে একটি অজানা জায়গায় নিয়ে যায়। তখনও হাতকড়া ও চোখ বাঁধা অবস্থায় প্লাস দিয়ে ফাহিমের নখ টানতে থাকে এবং বিভিন্নভাবে নির্যাতন করতে থাকে। যার ফলে ফাহিম জ্ঞান হারান। কয়েক ঘণ্টা পর যখন ফাহিমের জ্ঞান ফিরল, তখন একটি ছোট, জানালাবিহীন ঘরে বাঁধনমুক্ত অবস্থায় দেখতে পান। একটি ফ্যান বিকট শব্দে চলছিল, যা বাইরের সমস্ত আওয়াজকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল। দুর্বল, ক্লান্ত এবং দাঁড়াতে অক্ষম হয়ে ফাহিম মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।

তারা ফাহিমের হাত ধরে তুলে ঘরের অন্য একটি রুমে নিয়ে গেল। সেখানে তারা ফাহিমকে এমন একজন লোকের সামনে বসাল যাকে দেখে তাদের ঊর্ধ্বতন কেউ বলে মনে হচ্ছিল।

তিনি ফাহিম’কে বলেন,  মাদকাসক্তদের পুর্নবাসনে তাদের আয়ের অনেক ক্ষতি করছে এবং তাদের ব্যাপক আর্থিক লোকসানের কারণ হচ্ছে। এরপর সে কয়েকটি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে এবং আঙুলের ছাপ দিতে বাধ্য করে। অবশেষে ফাহিমকে সতর্ক করে দেয় যে, যদি তার কথা অমান্য করে তাহলে ফাহিম এবং তার পরিবারের জন্য গুরুতর পরিণতি অপেক্ষা করছে।

আবার ফাহিমকে আগের রুমে নিয়ে আসা হয়। ফাহিমকে আবার হাতকড়া পড়িয়ে ও চোখ বন্ধ করে ৩-৪ ঘন্টা পর অপরাধীরা মৌলভীবাজারের স্লুইচ গেইট নামক স্থানে ফেলে রেখে চলে যায়।

শাহ ফাহিমের ভাই শাহ মাহফুজ সমাচারকে জানান, কনসেপ্টের মার্কেটিং ম্যানেজার শেখ হামজা এবং ফিনান্স ম্যানেজার জোবায়ের আহমদ ফাহিমকে তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি ফাহিমের ওয়াইফ এবং তাকে জানান। জানার পর আমি (শাহ মাহফুজ) এবং জোবায়ের আহমদ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রভাবশালীর কাছে যান। তিনি বিভিন্ন জায়গায় ফোন দেন এবং জানতে পারেন কারা ফাহিমকে গুম করেছে। তারা প্রথমে ৫০ লাখ মুক্তিপণ দাবি করে, পরে বলে ২৫ লাখ টাকা দেওয়ার জন্য। পরে ফাহিমের পরিবার ১০ লক্ষ টাকা এবং কনসেপ্ট থেকে ৫ লক্ষ টাকা মোট ১৫ লক্ষ টাকা ঐ প্রভাবশালীর মধ্যস্থতার মাধ্যমে পাঠালে কয়েক ঘন্টা পরে স্লুইচ গেইট ব্রিজের পাশে ফেলে রেখে যায়। শাহ মাহফুজ আরও বলেন দীর্ঘদিন যাবত আমার ভাই সমাজের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন এইটাই আমার ভাইয়ের অপরাধ। 

শাহ ফাহিম আহমেদের প্রতিষ্ঠিত সংগঠন উই ফর বাংলাদেশের কার্য নির্বাহী সদস্য কাওসার আহমদ বলেন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সহযোগীতা ছাড়া মাদক সম্রাটেরা এত বড় সাহস করতে পারে না। তিনি আরও বলেন, গত জানুয়ারীতে শাহ ফাহিমকে আক্রমণ এবং হুমকির পর আমরা থানায় অভিযোগ করতে গেলে একজন কর্মকর্তা আমাদেরকে আ:লীগের দোসর বলেন। থানা থেকে বলা হয় আমরাই নিজেরা নিজেদের বিপদ ডেকে নিয়ে আসছি। আমরা এসব কার্যক্রম থেকে দূরে থাকলেনাকি এসব বিপদ আসবে না।

মানবাধিকার কর্মি আব্দুল কাদের বলেন, শাহ ফাহিম আহমেদ শহরের একজন পরিচিত ব্যাবসায়ী এবং তরুন সমাজ সেবক। তাকে গুম এবং মুক্তিপণের ঘটনাটি অতন্ত দু:খজনক। এটা আমাদের সচেতন মহলের জন্য অত্যন্ত লজ্জারও বলা যায়। তার পাশে আমদেরকে না দাঁড়ালে ভালো কাজ করতে মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।