মৌলভীবাজার প্রতিনিধি::
মৌলভীবাজারের ৪টি আসনেই ভুমিধস বিজয় হয়েছে বিএনপি’র প্রার্থীদের। চা বাগান ও সনাতন ধর্মবলম্বীরাই ধানের শীষে এককভাবে ভোট দেয়ায় এ বিষয় হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ফলাফল নিয়ে জেলার বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষের মধ্যে, চায়ের টেবিলে ও অফিস আদালতে বিশ্লেষণ চলছে। এ আবাস নির্বাচনের পূর্বেও পাওয়া গিয়েছিল। বিএনপি সেই আবাসকে কৌশলে কাজে লাগিয়ে একক বিজয় অর্জন করেছে। চা বাগানকে গুরুত্ব না দেয়ায় ধরাশায়ী হয়েছে জামায়াত।
জামায়াত নেতাদের অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাস ও ইসলামী দল থাকায় চা শ্রমিক ও সনাতন ভোটাররা বিএনপি’কে ভোট দেন। বিএনপিকে ভোট দেয়ার পিছনে সূদূর প্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে চা শ্রমিক ও সনাতন ভোটারদের।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারে ৯৩টি চা বাগান রয়েছে। জেলার প্রত্যেকটি চা বাগান কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীরা গড়ে ৯৫ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। ৪টি আসনেই চা বাগান ভোটার উল্লেখ যোগ্য। এ জেলার নির্বাচনে চা বাগানের ভোট বড় ফ্যাক্ট।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, মৌলভীবাজার-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী নাসির উদ্দিন আহমেদ (ধান) ৯৮ হাজার ২’শ ৮২ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব জামায়াতের মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা) ৮৩ হাজার ১৩ ভোট পেয়েছেন। বিএনপি প্রার্থী ১৫ হাজার ২শ ৬৯ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। এ আসনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে নিউ সমনবাগ চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধানের শীষ ১৩১৪, দাঁড়িপাল্লা ২৮২, পাথারিয়া চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধান ১২৩০, দাঁড়িপাল্লা ১৯৯, সোনারূপা চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধান ১৫০৯, দাঁড়িপাল্লা ১০৯, কাপনা পাহাড় চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধান ১৬১৩, দাঁড়িপাল্লা ১৪৭, সাগরনাল চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধান ১৪৯২, দাঁড়িপাল্লা ২৫৫, রতœা চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধান ১২৫১, দাঁড়িপাল্লা ১৫৯, ফুলতলা চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধান ১১৭৩, দাঁড়িপাল্লা ১৮৬, কালনীগড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধান ১১৮৫, দাঁড়িপাল্লা ১৩৯ ও ধামাই এ সি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধান ১৮৫০, দাঁড়িপাল্লা ৬২ ভোট পেয়েছে। এ আসনের চা বাগানের সবকটি কেন্দ্রের একই হাল।
মৌলভীবাজার-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী শওকতুল ইসলাম শকু (ধান) ৬৮ হাজার ৩’শ ৮১ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব জামায়াতের মো: সাহেদ আলী ৫৩ হাজার ৪’শ ৫৮ ভোট পেয়েছেন। ১৪ হাজার ৯শ ১৩ ভোট বেশি পেয়ে বিএনপি প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। এ আসনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে বরমচাল চা বাগানে ধানের শীষ ৯১৩, দাঁড়িপাল্লা ৮৫, ক্লিভডন চা বাগানে ধানের শীষ ৯৪৯, দাঁড়িপাল্লা ৮৩, দিলদারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধানের শীষ ৭৮৩, দাঁড়িপাল্লা ৩১৫, হলিছড়া চা বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ধানের শীষ ৭৮৩, দাঁড়িপাল্লা ৩১৫, গাজীপুর চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধানের শীষ ১৬৭৮, দাঁড়িপাল্লা ৪৮৭, লংলা চা বাগান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধানের শীষ ১৯৯৬, দাঁড়িপাল্লা ২২৭, চাতলাপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধানের শীষ ৯৯৪, দাঁড়িপাল্লা ৭২ ও রাঙ্গীছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধানের শীষ ৭৬৫, দাঁড়িপাল্লা ১৩২ ভোট পেয়েছেন। এ আসনের চা বাগানের সবকটি কেন্দ্রের একই হাল।
মৌলভীবাজার-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী এম নাসের রহমান (ধান) ১ লক্ষ ৫৬ হাজার ৭’শ ৫৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব জামায়াতের মো: আব্দুল মান্নান ৭৭ হাজার ৬’শ ৩৬ ভোট পেয়েছেন। বিএনপি প্রার্থী ৭৯ হাজার ১শ ২১ ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। এ আসনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে মৌলভী চা বাগানে ধানের শীষ ১০০৯, দাঁড়িপাল্লা ৮০, বিমলাচরণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ধানের শীষ ১৪৭৭, দাঁড়িপাল্লা ৪২৪, ইন্দানগর বে-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ধানের শীষ ৭৯৮, দাঁড়িপাল্লা ২৬৯, করিমপুর চা বাগানে ধানের শীষ ১২০৪, দাঁড়িপাল্লা ২৬০, ইটা চা বাগানে ধানের শীষ ১১১৬, দাঁড়িপাল্লা ৮৯৭, উদনা চা বাগানে ধানের শীষ ৭৯২, দাঁড়িপাল্লা ১৬৯, মাথিউরা চা বাগানে ধানের শীষ ১০৮৩, দাঁড়িপাল্লা ২৪০ ও রাজনরগ চা বাগানে ধানের শীষ ১৬৮৫, দাঁড়িপাল্লা ২৬৫ ভোট পেয়েছেন। এ আসনের চা বাগানের সবকটি কেন্দ্রের একই হাল।
মৌলভীবাজার-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী মো: মুজিবুর রহমান চৌধুরী (ধান) ১ লক্ষ ৭০ হাজার ৮’শ ৭৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্ব›িদ্ব বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের শেখ নূরে আলম হামিদী (রিক্সা) ৫০ হাজার ২’শ ৪ ভোট পেয়েছেন। ১ লক্ষ ২০ হাজার ৬শ ৭৩ ভোট বেশি পেয়ে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। এ আসনের ১৬৩ কেন্দ্রের মধ্যে দুই তৃতীয়াংশ চা বাগান। যার কারণে বিশাল ব্যবধানে ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্রাম ও শহরের মতো চা বাগানে ১১ দলীয় জোটের জোর প্রচারণা চালানো হলে অন্তত মৌলভীবাজার-১ ও ২ আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা বিজয়ী হতেন। চা বাগান ও সনাতন ধর্মবালম্বীদের ভোটে গুরুত্ব না দেয়ায় জামায়াত জোটের এমন হাল হয়েছে।
মৌলভীবাজার পৌর এলাকার জামায়াত মনোনীত কাউন্সিলর প্রার্থী আব্দুল কাদির নির্বাচনে জামায়াতের পরাজয়ের পিছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরে বলেন, জামায়াত নেতৃবৃন্দ টিম ভিত্তিক যেভাবে কাজ করার কথা ছিল সেভাবে করতে পারেননি। এছাড়া জনসম্পৃত্ততার বিশাল গ্যাপ ছিল। অপপ্রচারের মোকাবেলা করতে পারেনি জামায়াত। এই জন্য ভোটের মাঠে তা ব্যাপক প্রভাব ফেলে। আর বিশেষ করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের সাথে যোগাযোগ সেভাবে ছিলনা। তাদের ভয়ভীতি দেখানোর মাধ্যমে বিরোধীরা ভোট একরকম ছিনিয়ে নেয়। সেখানে আমাদের ভূমিকা ছিলনা বললেই চলে। মূলত এসব কারণেই জেলাজুড়ে আমাদের পরাজয় হয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সাবেক প্রচার সম্পাদক এম ইদ্রিস আলী বলেন, বিএনপির ফ্যামেলী কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষকদের সুদসহ ১০হাজার টাকা ঋণ মওকুফ ও ইমাম, মোয়াজ্জিন এবং পুরোহিতদের ভাতা, হেলথ কার্ড মতো প্রতিশ্রæতিগুলো মানুষজন বিশ^াস করেছে। এমনকি নি¤œ আয়ের মানুষের মাঝে বিএনপির এই ম্যাসেগুলো ভালোভাবে পৌঁছাতে পেরেছে এবং মানুষের মন জয় করতে পেরেছে। তাই নির্বাচনে সারাদেশের মতো মৌলভীবাজারেও ভালো ফলাফল অর্জন করতে পেরেছে।
জেলা বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি ও মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য নাসের রহমানের সহধর্মিনী রেজিনা নাসের বলেন, বিএনপি একটি জনপ্রিয় দল। বিগত ২০ বছরে দেশে কোন নির্বাচন হয়নি। যার জন্য জনগণ মুখিয়ে ছিল বিএনপিকে ভোট দেবার জন্য। এছাড়া আমি এবং আমার মেয়ে নির্বাচনে মহিলাদের নিয়ে কাজ করেছি। এই এলাকার মহিলার কনজারভেটিভ হবার কারণে আমরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে আলাদা করে তাদের সাথে কথা বলেছি এবং তারা আমাদের সাথে তাদের সুখ-দু:খের কথা বলেছে। তাদের দাবির বিষয়ে আমরা আশা দিয়ে তাই আমরা ব্যাপক সাড়া পেয়েছি।
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মো. ইয়ামীর আলী বলেন, নির্বাচনের আমাদের প্রতিপক্ষ টাকা দিয়ে ভোট কিনেছে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোট না পাওয়াসহ বিভিন্ন কারণ ছিল। বিশেষ করে চা শ্রমিক, হিন্দু ও আওয়ামী সমর্থকদের ভোট আমরা আনতে পারিনি। ফলাফল বিপর্যয়ের কারণগুলো আমরা বের করেছি। এগুলো নিয়ে এখন থেকে কাজ শুরু করেছি।